ছবি: সংবাদ সারাবেলা
দিনদিন সূর্যমূখী চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে মৌলভীবাজার জেলার কৃষকদের মাঝে। মাঠি আর উপযুক্ত আবহাওয়া নিশ্চিত হওয়ায় জেলায় সূর্যমূখী চাষ অনেক সম্প্রসারিত হচ্ছে এখন। আর এর নেপথ্যে ভুমিকা রাখছেন মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের কৃষি বিজ্ঞানীদের অনবদ্য নিত্য-নতুন সফল গবেষণা। জেলায় এ পর্যন্ত ৩টি সূর্যমূখীর সফল জাত উদ্ভাবন করেছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মৌলভীবাজার সহ সিলেট অঞ্চলে দিনদিন সূর্যমূখী চাষের প্রবনতা বাড়ছে। এ অঞ্চলে তেল ফসলের যে ঘাটতি সেটা পূরণের জন্য বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা চালাচ্ছেন তারা। সর্বশেষ সূর্যমূখী বারি-৩ নিয়েও গবেষণায় বেশ সফল হয়েছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা।
সরেজমিন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আকবরপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, ইন্সটিটিউটের গবেষকরা সেখানকার সমতল ভুমির মাত্র ৩০ শতক জায়গার উপর নতুন জাতের বারি-৩ সূর্যমূখী চাষ করেছেন। প্রতিটি সূর্যমূখী গাছের শাখায় ঝুলতে দেখা যায় বড় আকৃতির উচ্চ ফলনশীল হেড সমৃদ্ধ সুর্যমূখী। এটি তাদের পরীক্ষামূলক গবেষণার জন্য চাষাবাদ।
গবেষকরা জানিয়েছেন নতুন জাতের এই সূর্যমূখী চাষে পাওয়া যাবে বেশি পরিমাণের বিজ। এর বিশেষত্ব হচ্ছে ফসলটি সাধারণত অন্যান্য গাছের থেকে উচ্চতায় অনেক কম, আকারেও অনেক ছোট হয়ে থাকে। এর কারণ বাতাস প্রতিরোধ করা, যাতে গাছটি হেলে পড়ে না যায়। সাধারনত অন্য জাতের সূর্যমূখী গাছের দৈর্ঘ অনেক বেশি থাকে এবং বাতাসের পরিমাণ বেশি হলে গাছটিও হেলে পড়ে। নতুন উদ্ভাবন করা সূর্যমূখীর প্রতিটি গাছ সাধারণত খাটো এবং এর হেড বড় হওয়ায় বিজের পরিমাণ অনেক বেশি, ফলনও হয় বেশি।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট এর শাখা প্রতিষ্ঠান আকবরপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই খাটো জাতের বারি সূর্যমূখী-৩ উদ্ভাবন করেছেন। নতুন জাতের সূর্যমূখীতে তেলের পরিমাণ ৪০শতাংশ বলে দাবি গবেষকদের। তারা জানান, অন্যান্য জাতের তোলনায় এর তেলের পরিমাণও বেশি হয়ে থাকে। এর গুনাগুণও বেশি এবং পুষ্টিগুণ সমুদ্ধ। এর কারণে কৃষি ও কৃষকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা সমানভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অঞ্চলের আবহাওয়ার জন্য এই তেল ফসলের চাষাবাদ বেশ উপযোক্ত।
আকবরপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট এর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দীন জানান. প্রথমবারের মতো বারি-৩ সূর্যমূখী চাষ নিয়ে আমরা গবেষনা শুরু করি। এবং কৃষকদের কাছে এর বিজ সর্বরাহ করি। কৃষকরা ২০২৫ সাল থেকে এই জাতের ফসল চাষ করে সফল হয়েছেন। এই সূর্যমূখী বারি-৩ চাষাবাদ গোটা সিলেট বিভাগে আরো সম্প্রসারণ হবে। আকবরপুর কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট এ পর্যন্ত যে কয়েকটা সূর্যমূখীর জাত উদ্ভাবন করেছে এই জাতগুলোর মধ্যে বারি-৩ সূর্যমুখীতে তেলের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বলেও জানান তিনি।
সাধারণত সূর্যমূখী তেলে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ লিনোলিক এসিড রয়েছে। এবং ইরোসিক নাই বললেই চলে সূর্যমূখীতে। লিনোলিক এসিড এর মূল কাজটাই হলো শরীরের যে ক্ষতিকর কোলেস্টোরেল সেটাকে কমিয়ে আনে। এবং যেটা উপকারী কোলেস্টোরেল এটাকে বাদ দেয়া। এ কারণে সূর্যমূখী তেল মানুষের জন্য উপকারী তেল।
কৃষি গবেষকরা জানান, ফসলটি খাটো জাত হওয়ায় এটি ঢলে পড়েনা। বাতাসে কিংবা ঝরেও এর কোন ক্ষতি হয়না। এই জাতের ফসলে পোকা-মাকড় ও রোগ বালাই হয়না। এই জাতের সূর্যমূখী দেশের দক্ষিনাঞ্চলের হাওর অঞ্চলে চাষাবাদের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এই জাতের ফসল খড়া এবং লবনাক্ততায় বেশ সহনশীল। এই জাতের ফসল কৃষকদের মধ্যে বিস্তার লাভ করলে সিলেটের বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে যেখানে পানি সমস্যা রয়েছে সেখানেও এর ভাল ফলনের সম্ভানা রয়েছে।
কৃষি গবেষকদের দাবী বারি-৩ সূর্যমূখী জাতটি প্রতি শতাংশে ৭ থেকে ৮ কেজি বিজ উৎপাদন হয়। প্রতি হেক্টরে ২ টনের মতো বিজ পাওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে তেলের পরিমাণ হিসেব করলে প্রতি কেজিতে ২৫০ গ্রাম তেল পাওয়া যাবে। আর প্রতি মণে ১০ লিটার তেল পাওয়া যায়। যা সাধারণ জাতের সূর্যমূখীর বিজ থেকে সংগ্রহ করা তেল থেকে পরিমাণে বেশি।
এ পর্যন্ত ৩টি জাতের সূর্যমূখী গবেষণায় ব্যাপকভাবে সফল হয়েছেন আকবরপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মাহমুদুল ইসলাম নজরুল। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন এ জাতের সূর্যমূখী উৎপাদন বেশি হবে । এর কারণ এটি উচ্চতার কারণে ঢলে পড়বেনা, খাটো জাতের এই ফসলের হেড (মাথা) অনেক বড় হয়ে থাকে এবং ঢলে পড়বেনা। তিনি বলেন, বর্তমানে যে সূর্যমূখী কৃষকরা চাষ করছেন সেটি আকারে প্রায় ২মিটার দৈর্ঘ্য এবং বাতাসে ঢলে পড়ে বিজ নষ্ট হয়ে যায়, যার কারণে কৃষকরা আগ্রহ হারাচ্ছেন ওই জাতের সূর্যমূখী চাষাবাদে। এসব বিবেচনায় নতুন জাতের উদ্ভাবন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এবছর জেলায় মোট ১৪৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমূখী চাষ হয়েছে। যেখান থেকে প্রায় ১৫০ টন বিজ পাওয়া সম্ভব। বিগত বছরের তোলনায় এ বছর সূর্যমুখী উৎপাদন বেড়েছে এবং প্রতি বছছর উৎপাদনের পরিমাণ বাড়তে থাকবে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দীন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
