নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ এবং কলমাকান্দা উপজেলার বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত হাওর অঞ্চল। এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা বোরো ধান চাষ। বছরের একটি মাত্র ফসল এই বোরো ধানই তাদের সারা বছরের অন্নের সংস্থান করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে সরকারি ভর্তুকির অভাব, সারের চড়া মূল্য পরিমাণ মত ডিলেজ না পাওয়া যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কারণে হাওরের প্রান্তিক কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
হাওর অঞ্চলের কৃষকদের জন্য বিশেষ কোনো কৃষি ভর্তুকি বা প্যাকেজ না থাকায় তারা উৎপাদন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশেষ করে বর্গাচাষী ও প্রান্তিক কৃষকেরা কোনো ধরণের সরকারি ঋণ বা প্রণোদনা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। বাজারে সারের মূল্য নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি রাখা হচ্ছে বলে কৃষকদের অভিযোগ। রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং উন্নত বীজের চড়া মূল্যের কারণে বিঘা প্রতি চাষের খরচ গত কয়েক বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই গুণ বেড়ে গেছে। হাওর এলাকায় সেচ কাজের জন্য ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের ওপর নির্ভর করতে হয়। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে সেচ খরচ আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পানির অভাবে খেত শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও চড়া মূল্যে পানি কেনার সামর্থ্য কৃষকদের নেই।
মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিংগাপুতা হাওয়ের কয়েকজন কৃষক জানান, “আমরা বছরে মাত্র এক মাস ফসল পাই। যদি সেই ফসলে খরচ তুলতে না পারি, তবে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে সার বা ডিজেলে কোনো ছাড় না পাওয়ায় আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি।” মহাজন এবং এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কৃষকেরা চাষবাস করছেন। ফসল তোলার পর সেই ফসল বিক্রি করে ঋণের সুদ দিতেই তাদের সব টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে।
হাওরের কৃষিতে অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হলো অকাল বন্যা। পাহাড়ী ঢলে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে কৃষকেরা সবসময় তটস্থ থাকেন। এই অনিশ্চয়তার মাঝেও যদি সরকার থেকে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি বা বিমা সুবিধা না পাওয়া যায়, তবে কৃষকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি: উৎপাদন খরচ বাড়ায় অনেক কৃষক চাষাবাদ কমিয়ে দিচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
কৃষকেরা গ্রামীণ মহাজনদের কাছ থেকে ‘দাদন’ বা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। জীবনযাত্রার খরচ চালাতে না পেরে অনেক ভূমিহীন কৃষক হাওর ছেড়ে ঢাকা বা অন্যান্য শহরে শ্রমিক হিসেবে চলে যাচ্ছেন।
নেত্রকোণা হাওরের কৃষকদের রক্ষা করতে দ্রুত নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
হাওর অঞ্চলের জন্য বিশেষ ‘কৃষি প্যাকেজ’ ঘোষণা করা। সরাসরি কৃষকদের কাছে ভর্তুকি মূল্যে সার, বীজ ও ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা। সহজ শর্তে ও বিনাসুদে কৃষি ঋণ প্রদান। অকাল বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও দ্রুত ফসল কাটার জন্য পর্যাপ্ত কম্বাইন হারভেস্টর সরবরাহ করা। ধান সংগ্রহের মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে ধান ক্রয় করা।
হাওর এলাকার কৃষকেরা দেশের খাদ্য চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করেন। তাদের এই দূরবস্থা নিরসনে সরকার যদি অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে নেত্রকোণার হাওর অঞ্চল এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে পড়বে। কৃষকদের বাঁচাতে কৃষি খাতে সরাসরি নগদ ভর্তুকি ও তদারকি বাড়ানো সময়ের দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
