মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমান এমপি বলেছেন, দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণে সৌদি সরকার অর্থায়ন করার কথা থাকলেও পরবর্তীতে যখন খোঁজ নিয়ে জানলাম শেখ হাসিনা সরকারের সাথে সৌদি বাদশার মনোমালিন্য‘র কারণে মডেল মসজিদ নির্মাণে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় সৌদি সরকার।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক সড়কের জগন্নাথপুর এলাকায় সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নবনির্মিত জেলা মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ তথ্য জানান নাসের রহমান।
নাসের রহমান এর বক্তব্য চলাকালে উপস্থিত দর্শকরা জানতে চান কী কারণে সৌদি সরকার মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করেছে? তখন তিনি জানান, মনোমালিন্য তৈরি হয়েছে আমাদের নেত্রীকে নিয়ে। তাঁর কারণ হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি যে অন্যায় অত্যাচার হচ্ছে সে বিষয়ে শেখ হাসিনার সাথে সৌদি বাদশার মনোমালিন্য তৈরি হওয়ার প্রেক্ষিতে মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু শেখ হাসিনা তো আগেই ঘোষণা দিয়েছেন সৌদি অর্থায়নে ৫৬০টি মডেল মসজিদ দিচ্ছে। তবে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইজ্জত রক্ষার স্বার্থে শেখ হাসিনা সরকার কাজ শুরু করে। তিনি বলেন, এই প্রকল্প এখনো চলমান আছে। এখনো সারা দেশে ১৮৬টি মসজিদ নির্মাণ বাকি আছে।
নাসের রহমান বলেন, মসজিদটি চালু হওয়ার পর এর মেন্টেনেইস এর অর্থ যদি সংশ্লিষ্ট দফতর না দেন তাহলে জেলা প্রশাসকের এলআর ফান্ড থেকে দিতে হবে। মসজিদটি যেভাবে চালু হয়েছে আমরা সেভাবে দেখতে চাই। এটার মেন্টেনেস এর জন্য যেন কোন গাফিলতি না করা হয়। এ ব্যাপারে সকলকে সচেতন থাকার নির্দেশ দেন তিনি। এসময় তিনি আরও বলেন, মসজিদের দেয়ালে পানের পিক যেন কেউ না ফেলে সেটা সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং করতে হবে। যদি পানের পিক ফেলার দৃশ্য ধরা পড়ে তাহলে সাথে সাথে তাঁকে আটক করতে হবে এবং জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দিতে হবে তাঁর বিরুদ্ধে। এই মসজিদটাকে যেন আমরা সবাই সুন্দরভাবে মেইন্টেন করি।
ইসলামীক ফাউন্ডেশন মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের উদ্যেগে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল। সাবেক জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন মাসুদ এর সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইসলামীক ফাউন্ডেশন এর উপপরিচালক মো. ফারুক আলম। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মুমিনুল হক এমপি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোঃ মনিরুল ইসলাম, জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান, জেলা বিএনপির আহবায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন, সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফয়সাল রহমান, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মামুন আল ফারুক এবং মডেল মসজিদ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মাদ ফেরদৌস-উজ-জামান।
এসময় বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, মহানবী (সা:) মসজিদ থেকেই রাষ্ট্র পরিচলান করতেন। যেটি এখন আর তেমন দেখা যায়না। তাই জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি ইসলামি শিক্ষা, গবেষণা, সামাজিক সম্প্রীতি, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং জনসেবামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখবে। তাঁরা এ ধরনের উদ্যোগকে ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চা এবং সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলে মনে করেন।
মৌলভীবাজারের শহরের উপকন্ঠে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে জগন্নাথপুর এলাকায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হয় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের অধিনে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে চার তলাবিশিষ্ট আইকনিক জেলা মডেল মসজিদ নির্মাণ কাজ। ৪৫ শতাংশ জমির উপর ১১০ ফুট প্রশস্ত ও ১৭০ ফুট দৈর্ঘ্য‘র মসজিদটি ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মার্ক বিল্ডার্স লিমিটেড নির্মাণ কাজ শুরু করে। এতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১৭৪৩. ৬৮ লক্ষ টাকা। এ পর্যন্ত জেলা মডেল মসজিদ নির্মাণে ডিপিপি মূল্য ধরা হয়েছে ১৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে এপর্যন্ত ব্যায় হয়েছে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। যার চুক্তিমুল্য ধরা হয়েছে ১৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। মসজিদটির প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সম্পন্নের কথা থাকলেও দেরিতে কাজ শুরু করায় কয়েকদফা সময় বাড়িয়ে অবশেষে চলতি বছর ২০২৬ সালের জুনে কাজ সম্পন্ন হয়।
মসজিদটির একদিকে বিশাল হাওর আর অন্যদিকে উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলা আর সবুজ বন। বর্ষায় হাওরের থৈ থৈ পানিতে গোটা এলাকার প্রকৃতিতে নতুন এক আবহ তৈরি হবে। ফলে পাল্টে যাবে পুরো এলাকার দৃশ্য। দূরপাল্লার গাড়ি থেকে উপভোগ করা যাবে মসজিদটির শৈল্পীক কারুকাজ সম্বলিত অপার সৌন্দর্য। এক কথায় দীর্ঘ আড়াই বছর পর প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ায় বদলে গেছে পুরো এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র। এতো দিন ভাড়ায় থাকা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব কার্যালয়ও এখন থেকে পরিচালিত হবে জেলা মডেল মসজিদে। জেলা জুড়ে ইফার সব কার্যক্রমও পরিচালিত হবে এখান থেকে। মসজিদ ভিত্তিক গণশিক্ষা ও ইমাম প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সব কার্যক্রমেও আসবে গতিশীলতা।
গণপূর্ত বিভাগ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র জানিয়েছে, চারতলা বিশিষ্ট জেলা মডেল মসজিদটিতে রয়েছে বিশাল কার পার্কিং, মৃতদেহ গোসল কক্ষ, লাইব্রেরী, গবেষনা ও দীনি দাওয়া কার্যক্রম, পবিত্র কুরআন হেফজ, শিশু শিক্ষা, অতিথিশালা, বিদেশী পর্যটকদের আবাসন, হজ্জযাত্রীদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, ইমামদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ব্যবস্থা রয়েছে। ইমাম-মুয়াজ্জিনের আবাসনসহ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যও অফিসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া জেনারেটর কক্ষ, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের নামাজের আলাদা কক্ষ, রান্না ঘর, পুরুষ-মহিলাদের পৃথক নামাজের স্থান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অফিস, অজুখানা। দৃষ্টিনন্দন সীমানা প্রাচীর ও একটি বিশাল সুউচ্চ মিনার। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে মসজিদটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একসাথে হাজারও মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। তবে জেলা মডেল মসজিদ কাজ সম্পন্ন হওয়ায় স্থাপনাটি উদ্বোধন হলেও পেশ ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম সহ গুরুত্বপূর্ণ স্টাফদের এখনো নিয়োগ দেয়নি কর্তৃপক্ষ। তারা জানিয়েছে চলতি মাসের ১৮জুলাই এসব পদে জনবল নিয়োগ হতে পারে।
এ দিকে বহু প্রতিক্ষিত জেলা মডেল মসজিদ উদ্বোধন হওয়ায় জগন্নাথপুর গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে খুশির জোয়ার বইছে। নিজ গ্রামে সরকারিভাবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করায় তারা খুশি। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ,আলেম, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
