চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ভারী যানবাহনের ধাক্কায় একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি পৃথক দুর্ঘটনায় নারী, শিশুসহ পাঁচজন এবং সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন। পরপর এসব দুর্ঘটনায় মহাসড়কে লরি ও কনটেইনারবাহী যানবাহনের চলাচল, চালকদের দায়িত্বশীলতা এবং পরিবহন কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার কুমিরায় আইআইইউসির প্রধান ফটকের সামনে ডালাস পেট্রোল পাম্পের বিপরীত পাশে দুর্ঘটনাটি ঘটে। একটি কনটেইনারবাহী লরির ধাক্কায় ৮ নম্বর রুটের একটি মিনিবাস উল্টে গেলে চাপা পড়ে মাইশা মুশফিরাত (২১) নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিহত হন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর দুই সহপাঠীসহ মিনিবাসের অন্তত ১০ যাত্রী আহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাইওয়ে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকামুখী লরিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক এলাকা অতিক্রম করার সময় সামনে একটি প্রাইভেট কার হঠাৎ ইউটার্ন নেয়। গাড়িটিকে বাঁচাতে গিয়ে লরিটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিনিবাসটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এতে বাসটি উল্টে যায়। গুরুতর আহত মাইশাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লরিচালককে গ্রেপ্তার এবং চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, কেডিএস ডিপোর অবৈধ পার্কিং বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের উভয় পাশে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ক্যাম্পাস এলাকায় সড়ক পারাপারে নিরাপত্তাকর্মী বাড়ানো। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাসও বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এর আগে গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে উপজেলার ছোট কুমিরা এলাকায় রয়েল সিমেন্ট গেটের কাছে আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শাপলা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস মহাসড়কের পাশে দাঁড় করিয়ে মেরামত করা হচ্ছিল। এ সময় কয়েকজন যাত্রী বাস থেকে নেমে সড়কের পাশে কাঠের স্তুপের ওপর বসে অপেক্ষা করছিলেন। এমন সময় নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি কনটেইনারবাহী লরি তাঁদের চাপা দেয়।
এ ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৩ জন নিহত হন। গুরুতর আহত ছয়জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ২ জনের মৃত্যু হয়। নিহত পাঁচজনের মধ্যে ছিলেন তিন নারী, একজন পুরুষ ও আট বছর বয়সী এক শিশু। পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় জড়িত লরিটি লোহার রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের একটি খালি লরি ছিল। দুর্ঘটনার পর লরিটি আটক করা হলেও চালক পালিয়ে যান।
পরপর দুটি দুর্ঘটনার চিত্রে মহাসড়কে ভারী যানবাহনের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক ঘটনায় যান্ত্রিক ত্রুটিতে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের যাত্রীরা প্রাণ হারিয়েছেন, অন্য ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থী দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরাও এখন নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কে চলাচলকারী অনেক লরি ও ভারী যানবাহনের চালক নির্ধারিত গতিসীমা ও ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করেন না। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং অসতর্কভাবে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও ডিপোকেন্দ্রিক ভারী যানবাহনের চলাচল এবং সড়কের পাশে পার্কিং নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ঘটনা ঘটার পর শুধু চালককে আটক বা মামলা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। চালকের লাইসেন্স ও পেশাগত দক্ষতা যাচাই, গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নজরদারি এবং পরিবহন কোম্পানির দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। কোনো চালকের অবহেলা বা বেপরোয়া আচরণে প্রাণহানি ঘটলে সংশ্লিষ্ট মালিক ও পরিবহন প্রতিষ্ঠানের দায়ও যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে আইআইইউসির প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপদে মহাসড়ক পারাপারের জন্য ফুটওভারব্রিজ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী ও প্রয়োজনীয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। একইভাবে মহাসড়কের পাশে যান্ত্রিক ত্রুটিতে আটকে পড়া যানবাহন ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্কসংকেত, পর্যাপ্ত দূরত্বে সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
একের পর এক প্রাণহানির পরও মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন এলাকাবাসীর। দুর্ঘটনার দায়ভার শুধু চালকের, নাকি সংশ্লিষ্ট পরিবহন কোম্পানি ও ব্যবস্থাপনারও—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সচেতন মহলের দাবি, দুটি দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বেপরোয়া লরি চলাচল নিয়ন্ত্রণ, চালকদের লাইসেন্স ও দক্ষতা যাচাই, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ডিপোর যানবাহনের পার্কিং ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের জীবন ও চলাচলের মৌলিক অধিকার। আর কোনো পরিবারকে স্বজন হারানোর বেদনায় কাঁদতে না হয়, সে জন্য সীতাকুণ্ডের মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
