ইরানের আকাশে এখন ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হামলার হুমকি দিচ্ছেন আর অন্যদিকে দেশে গণঅসন্তোষ তীব্রতর হচ্ছে। এই উভয়সংকটের সন্ধিক্ষণে রয়েছে তেহরান। চাপের মুখে ইরান ইউরেনিয়ামের মজুত কমাতে রাজি হয়েছে। বিষয়টি উঠতে পারে আগামী বৃহস্পতিবার ভেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায়। দ্বিপক্ষীয় বৈঠক চললেও সংঘাতের আশঙ্কা কিন্তু কমছে না। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচজুড়ে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। ইরানও কৌশল সাজাচ্ছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলে করণীয় ও প্রশাসনিক দায়িত্বও অঘোষিতভাবে নির্ধারিত হয়েছে। ইরান সব মিলিয়ে যুদ্ধ ও টিকে থাকার লড়াইয়ে সব প্রস্তুতি নিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এখন এক অভিজ্ঞ নেপথ্য কারিগরের হাতে—তিনি হলেন আলি লারিজানি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির এই বিশ্বস্ত সেনাপতিই এখন কার্যত দেশটি পরিচালনা করছেন।
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার এবং বর্তমানে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান। গত কয়েক মাসে তার ক্ষমতা এতটাই বেড়েছে যে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। পেজেশকিয়ান নিজেই প্রকাশ্য জনসভায় বলছেন, ‘আমি একজন ডাক্তার, রাজনীতিবিদ নই।’ এমনকি ইন্টারনেটের ওপর থেকে বিধিনিষেধ সরানোর মতো সিদ্ধান্তের জন্যও প্রেসিডেন্টকে এখন লারিজানির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
ইরানের প্রস্তুতি: ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের ছয়জন কর্মকর্তা এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের সদস্যদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, খামেনি একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছে ফোর লেয়ার্স অব সাকসেশন বা চার স্তরের উত্তরসূরি পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলায় খামেনি নিজে বা শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব নিহত হলেও যেন রাষ্ট্রযন্ত্র অচল না হয়। খামেনি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য অন্তত চারজন করে বিকল্প ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই ক্ষুদ্র বৃত্তও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
সামরিক প্রস্তুতি: ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করতে ইরাক সীমান্তের কাছে এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করতে পারস্য উপসাগরের উপকূলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে। সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে ইরান মাঝেমধ্যেই হরমুজ প্রণালি বন্ধের মহড়া দিচ্ছে, যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে প্রধান শহরগুলোর রাস্তায় সাদা পোশাকে বাসিজ মিলিশিয়া এবং বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কে হবেন পরবর্তী নেতা: ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে এখন একটি আলোচনা বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে, আর তা হলো—যদি রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে কে হবেন ‘ইরানের পরবর্তী নেতা?’ এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে আলী লারিজানির নাম। তার পরেই আছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি।
খামেনি ১২ দিনের ইসরায়েল যুদ্ধের সময় আত্মগোপনে থাকাকালে তার ধর্মীয় উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। লারিজানি সেই তালিকায় নেই, কারণ তিনি উচ্চপর্যায়ের শিয়া ধর্মীয় নেতা বা ‘আয়াতুল্লাহ’ নন। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধের ময়দানে খামেনির প্রধান সেনাপতি হিসেবে লারিজানিই এখন অপ্রতিরোধ্য।
বিশ্লেষক ভালি নাসরের মতে, খামেনি এখন নিজেকে ‘শহীদ’ হিসেবে দেখতেও প্রস্তুত। তিনি তার উত্তরাধিকার ও ইসলামী ব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ক্ষমতা বণ্টন করে দিচ্ছেন।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ইরান: ইরান একদিকে যেমন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সীমিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বজায় রেখে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী, অন্যদিকে কোনো আলটিমেটামের মুখে মাথানত করে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতেও রাজি নয়। কূটনৈতিক টেবিলে নমনীয়তা আর যুদ্ধের ময়দানে কঠোর প্রস্তুতির এক সংমিশ্রিত নীতি নিয়ে এগোচ্ছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি।
এর অংশ হিসেবে ইরান তাদের সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুত কমাতে রাজি হয়েছে। তবে তা হতে হবে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএর অধীনে। আর নিজেদের কাছে থাকা অতি সমৃদ্ধ ৩০০ কেজি ইউরেনিয়াম রপ্তানি করবে না তেহরান।
এর মধ্যে আলোচনার টেবিলে ফিরতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আগামী বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বৈঠক করবে তারা। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি এ তথ্য জানিয়েছেন।