ছবি: সংগৃহীত।
পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের চামড়াশিল্পের অবস্থান পুনরুদ্ধারে আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।
সাভারের চামড়াশিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সচল রাখা, বিনামূল্যে লবণ বিতরণ, বিশেষ ঋণ সুবিধা, মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, বাজার তদারকিসহ নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
সম্প্রতি চামড়াশিল্প খাতের উন্নয়নে গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্স সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশে প্রায় এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ চামড়া সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করাই সরকারের লক্ষ্য।
সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে বিশেষ প্রস্তুতি : কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জন্য সাভারের শিল্পনগরীর কারখানাগুলোতে লবণ ও কেমিক্যাল মজুদ করা হয়েছে।যন্ত্রপাতি সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। ট্যাংক পরিষ্কার ও মেরামত করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য নতুন দুটি পুকুর খনন করা হয়েছে।
বিসিক চামড়াশিল্প নগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ান বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত শুক্রবার বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ সারা দিন কাজ করেছে।প্রতিটি লাইন, ফিডার, সাবস্টেশন ও ডিস্ট্রিবিউশন প্যানেল পরীক্ষা করা হয়েছে।’
সম্প্রতি চামড়াশিল্প নগরী পরিদর্শনে গিয়ে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত চামড়া। কিন্তু হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিশিল্প সাভারে স্থানান্তর ছিল অপরিকল্পিত ও অবহেলাপূর্ণ। ফলে শিল্পটি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘সারা বছর দেশে যে পরিমাণ চামড়া সংগৃহীহ হয়, তার পুরোটা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি করা গেলে ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। তবে ঈদ সামনে রেখে বাড়তি বর্জ্যের চাপ সামাল দিতে বর্তমান সক্ষমতার সিইটিপি যথেষ্ট নয়। পরিবেশ সুরক্ষায় বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’
মন্ত্রী আরো বলেন, ভবিষ্যতে আর্থিক ও কারিগরি সক্ষম ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) স্থাপনে উৎসাহী করা হবে, যাতে কেন্দ্রীয় ইটিপির ওপর চাপ কমে এবং পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ আরো কার্যকর হয়।
বিনামূল্যে লবণ বিতরণ : সরকার দেশের মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ কেনা হয়েছে। চামড়া সংগ্রহের পরপরই লবণ প্রয়োগ নিশ্চিত করে সংরক্ষণে ক্ষতি কমানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
বিশেষ ঋণ সুবিধা : চামড়া ব্যবসায়ীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ঋণ সুবিধা ঘোষণা করেছে। গত ৫ মে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পুনঃ তফসিল বা খেলাপি ঋণ থাকা ব্যবসায়ীরাও নির্দিষ্ট শর্তে ঋণ পাবেন, যাতে তাঁরা পর্যাপ্ত চামড়া সংগ্রহ করতে পারেন।
ডেটাবেইস ও নিবন্ধনের উদ্যোগ : চামড়া সংগ্রহ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে দেশব্যাপী আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের একটি খসড়া ডেটাবেইস প্রস্তুত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই খাতের ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
চামড়ার ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ : বিগত বছরগুলোতে কোরবানির চামড়ার দরপতন ও অব্যবস্থাপনা ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করেছে। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ মনিটরিং সেল কাজ করবে।
এ বছর সরকার লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ঢাকার মধ্যে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। গত বছরের চেয়ে এবার প্রতি বর্গফুটে দাম বেড়েছে ২ টাকা। এ ছাড়া খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ : সঠিক নিয়মে চামড়া না ছাড়ানো এবং সময়মতো লবণ না দেওয়ায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। এই ক্ষতি কমাতে সরকার দেশব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কসাই ও ইমামদের চামড়া ছাড়ানো এবং প্রাথমিক সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচার : কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হবে। এতে জানানো হয়েছে, কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনা তদারকিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। এসংক্রান্ত তথ্য ও সহায়তার জন্য হটলাইন নম্বর ০১৬১৭-৩৩৮০৬৭ চালু করা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা : খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের পর পরিবেশগত সনদের অভাবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে পড়ে। সরকারের এবারের উদ্যোগ সেই অবস্থার পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদ বলেন, ‘সাভারের সিইটিপি সঠিকভাবে পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক মানের সনদ পাওয়া সময়সাপেক্ষ বিষয়। এখানকার অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো কমপ্লায়েন্স অর্জন করতে পারেনি। ফলে চামড়া রপ্তানি বাড়ছে না।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
