ছবি: সংগৃহীত।
কোনো প্রটোকল নেই, নেই আগাম খবর। ব্যক্তিগত গাড়িচালককে নিয়ে গত মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ ডিএসসিসির ৫ নম্বর আঞ্চলিক কার্যালয়ে হাজির হন প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।
৯টা ২ মিনিটে অফিসের ফটক আটকে হাজিরা খাতা মেলাতেই দেখা গেল ২৫ শতাংশ কর্মী তখনো অনুপস্থিত। ক্ষুব্ধ প্রশাসক অনুপস্থিতদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সচিবসভায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকাণ্ডে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সরকারের এই নির্দেশনার ফলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও মাঠ পর্যায়ের দপ্তরে বিচ্ছিন্নভাবে চালু থাকা ডিজিটাল হাজিরাকে সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ আরো গুরুত্ব পাচ্ছে। লক্ষ্য শুধু কে কখন অফিসে ঢুকলেন বা বের হলেন, তা জানা নয়। উপস্থিতির তথ্যকে কাজে লাগিয়ে সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের জবাবদিহি এবং নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।
জানা গেছে, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে বিচ্ছিন্নভাবে ডিজিটাল হাজিরা চালু থাকলেও এবার সেটিকে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর ডিজিটাল হাজিরার বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তত্ত্বাবধান করছে। সব হাজিরা ব্যবস্থা একীভূত করে একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে নজরদারির ব্যবস্থা তৈরিতে আইসিটি বিভাগ সহায়তা করছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সব হাজিরা সিস্টেমকে ইন্টিগ্রেট করার ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করছি, যেন সেন্ট্রালি একটা ড্যাশবোর্ডে সবকিছু মনিটর করা যায়। এই কাজটা আমরা শুরু করেছি, একটু সময় লাগবে।’
বাংলাদেশে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয়ভাবে উপস্থিতির তথ্য দেখা যাচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৫৬৮টি কার্যালয়েও কেন্দ্রীয়ভাবে বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থার ব্যবহার হয়েছে। সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল হাজিরা চালু করেছে। সেখানে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ, আঙুলের ছাপ, আরএফআইডি কার্ড ও পাসওয়ার্ডের সমন্বিত ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে হাজিরা পর্যবেক্ষণ করা যায়।
শুধু হাজিরা নয়, নজর কাজে : শতভাগ ডিজিটাল হাজিরা চালু হলে একজন কর্মকর্তা সকাল ৯টায় অফিসে এসেছেন কি না, সেটি জানা যাবে। কিন্তু তিনি অফিসে এসে কী কাজ করছেন, কতগুলো ফাইল নিষ্পত্তি করেছেন, নাগরিকের আবেদন কত দিনে শেষ করেছেন বা তাঁর সিদ্ধান্তের কারণে কোনো সেবা আটকে আছে কি না, তা শুধু হাজিরা দিয়ে জানা যাবে না। এখানেই কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কেপিআই (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) বা কর্মদক্ষতার সূচক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, “সরকারি দপ্তরে কেন্দ্রীয়ভাবে ডিজিটাল হাজিরা চালুর উদ্যোগ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে শুধু উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই সেবার মান বাড়বে না। হাজিরার তথ্যকে দপ্তর ও পদভিত্তিক ‘কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর’ বা কেপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।” ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘প্রথমে যেটা প্রয়োজন তা হলো—জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সব দপ্তরের জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা ও নিরাপদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।’
মেশিন বসিয়েও কাজ হয়নি : সারা দেশে ডিজিটাল হাজিরা চালুর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রযুক্তি নয়, ব্যবস্থাপনাও। মাদারীপুর সদর উপজেলার ২০২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের জন্য বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন বসানো হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগসহ বিভিন্ন সমস্যায় বহু মেশিন বছরের পর বছর কার্যকর হয়নি। পরে যন্ত্রগুলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। ডিজিটাল হাজিরা কার্যকর করতে ইন্টারনেট, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হয়। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের ডিজিটাল প্রস্তুতির দুর্বলতাও রয়েছে। সিপিডির গবেষণায় ২৬৭টি স্থানীয় সরকারি কার্যালয়ের ই-গভর্ন্যান্স প্রস্তুতির সামগ্রিক স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৩৮.৯। অবকাঠামোগত প্রস্তুতির স্কোর আরো কম ২৪.১।
জিও-ফেন্সিং ও তথ্য নিরাপত্তা : মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে শুধু বায়োমেট্রিক হাজিরা যথেষ্ট নয়। একজন কর্মকর্তা অফিসে এসে হাজিরা দিয়ে পরে কর্মস্থলের বাইরে চলে গেলে বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা তা ধরতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে জিও-ফেন্সিং কার্যকর হতে পারে।
ডিজিটাল হাজিরায় আঙুলের ছাপ, মুখমণ্ডলের ছবি কিংবা অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করা হলে তথ্যের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এসব তথ্য সাধারণ পাসওয়ার্ডের মতো পরিবর্তন করা যায় না। তাই তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হবে, কারা তা দেখতে পারবেন, কত দিন রাখা হবে এবং তথ্য ফাঁস হলে দায় কার, তা স্পষ্ট করতে হবে। কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন রয়েছে। তথ্য যত বেশি এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হবে, সাইবার হামলা বা অননুমোদিত ব্যবহারের ঝুঁকিও তত বাড়বে। ফলে শক্তিশালী এনক্রিপশন, বহুস্তরীয় প্রবেশাধিকার, নিরীক্ষাব্যবস্থা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
ভারত ও এস্তোনিয়ার শিক্ষা : ভারত ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসগুলোতে আধার-সক্ষম বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। পরে কেন্দ্রীয় সরকারি ও অধীন দপ্তরগুলোতে তা সম্প্রসারিত হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইরিসের পাশাপাশি মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও উপস্থিতি দেওয়ার ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। এস্তোনিয়া ডিজিটাল সরকারকে কোনো একটি যন্ত্র বা প্রকল্প হিসেবে না দেখে ডিজিটাল পরিচয়, তথ্য বিনিময়, সরকারি ডেটাবেইস ও অনলাইন সেবাকে একটি সমন্বিত অবকাঠামোর অংশ করেছে। সিঙ্গাপুরও সরকারি সেবায় কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পরিচয় অবকাঠামো ব্যবহার করছে।
শতভাগ ডিজিটাল হাজিরার পথ : দেশে শতভাগ ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করতে প্রথমে একটি জাতীয় সরকারি কর্মী ডিজিটাল রেজিস্ট্রি তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। সেখানে প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি ইউনিক ডিজিটাল আইডি থাকবে। কর্মস্থল বদল হলে নতুন করে পুরো প্রক্রিয়া করতে হবে না; একই পরিচয় নতুন অফিসে স্থানান্তরিত হবে। দ্বিতীয় ধাপে সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের হাজিরা ব্যবস্থা একটি জাতীয় অ্যাটেনডেন্স ডেটা প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকার জন্য ডিভাইসে স্থানীয়ভাবে তথ্য সংরক্ষণ এবং ইন্টারনেট এলে কেন্দ্রীয় সার্ভারে তথ্য পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তৃতীয় ধাপে হাজিরার সঙ্গে কেন্দ্রীয় কেপিআই ড্যাশবোর্ড যুক্ত করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য দেখতে পারবেন। কোনো অফিসে অনুপস্থিতির হার বেশি হলে, কোনো কর্মকর্তার ফাইল নিষ্পত্তির সময় অস্বাভাবিকভাবে বেশি হলে বা কোনো সেবা নির্ধারিত সময়ের বাইরে গেলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠানো যেতে পারে। চতুর্থ ধাপে বেতন, ছুটি ও পদোন্নতির সঙ্গে হাজিরা ও কর্মদক্ষতার তথ্য যুক্ত করা যেতে পারে। তবে এর আগে সুস্পষ্ট বিধিমালা দরকার।
জনসেবার মান কতটা বাড়বে : খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিজিটাল হাজিরা চালু হলে জনসেবার মান ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ডিজিটাল হাজিরা প্রশাসনিক সময় ও নজরদারির ব্যয় কমাতে পারে, অনুপস্থিতি ও সময়ানুবর্তিতার বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল হাজিরা চালুর বিষয়ে অনেক দিন ধরে আলোচনা চললেও এর সঠিক বাস্তবায়ন এত দিন দেখা যায়নি। অবশেষে সব সরকারি অফিসে ডিজিটাল হাজিরা বাধ্যতামূলক করার যে পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। হাজিরার এই ব্যবস্থাটি কার্ডভিত্তিক না করে সরাসরি ফিঙ্গারপ্রিন্ট অথবা ‘লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন’ পদ্ধতিতে করা উচিত, যেন একজন কর্মকর্তা অফিসে শারীরিকভাবে না এসেও অন্যের মাধ্যমে কার্ড পাঞ্চ করে হাজিরা দেওয়ার সুযোগ না পান।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
