ছবি: সংগৃহীত।
ঈদের সকাল যেন এক নরম আলোয় মোড়া আবেগের উৎসব। দীর্ঘ এক মাসের সংযম, আত্মশুদ্ধি আর অপেক্ষার পর যখন ঈদের দিনটি আসে, তখন মানুষের ভেতরে জমে থাকা ভালোবাসা, অভিমান আর অজস্র অনুভূতি যেন একসাথে পথ খুঁজে নেয়। নামাজ শেষে ঈদগাহ প্রাঙ্গণে, খোলা আকাশের নিচে, শহুরে গলি কিংবা গ্রামের সরু মেঠোপথে শুরু হয় সেই বহুল প্রতীক্ষিত দৃশ্য কোলাকুলি। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মানুষের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতির এক নিঃশব্দ প্রকাশ।
কোলাকুলি এমন এক ভাষা, যার কোনো শব্দ নেই, তবুও তা সবচেয়ে বেশি কথা বলে। একটি আলিঙ্গনের ভেতরে থাকে অগণিত না বলা গল্প কেউ ক্ষমা চায়, কেউ ক্ষমা করে, কেউ শুধু ভালোবাসা জানায়। অনেক সময় এমন হয়, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অভিমান বা ভুল বোঝাবুঝি, যা কথার মাধ্যমে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি, তা এক মুহূর্তের কোলাকুলিতে গলে যায়। এই এক স্পর্শেই যেন মানুষের ভেতরের কঠিন দেয়ালগুলো ভেঙে পড়ে।
ঈদের কোলাকুলি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় আমরা আলাদা নই, আমরা একে অপরেরই অংশ। সমাজে যত বিভাজনই থাকুক, এই একটি দিনে মানুষ সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক কাতারে দাঁড়ায়। সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ হয়ে ওঠে শুধুই মানুষ। এই কোলাকুলি তাই সামাজিক সমতার এক প্রতীক, যেখানে হৃদয়ের কাছে কোনো প্রাচীর টিকে থাকতে পারে না।
গ্রামের ঈদে কোলাকুলির দৃশ্য যেন এক অন্যরকম প্রাণবন্ত চিত্র। নামাজ শেষে ঈদগাহ ময়দানে থেকে সবাই যখন বাড়ি ফেরার পথে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, তখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আন্তরিকতার উষ্ণতা। সুজলা সুফলা বাংলার মেঠোপথ আর খোলা আকাশ সবকিছু মিলে তৈরি হয় এক নিখাদ আবহ, যেখানে প্রতিটি আলিঙ্গন হয়ে ওঠে স্মৃতির অংশ। অন্যদিকে শহরের ব্যস্ততায়ও কোলাকুলির আবেদন কমে না। কোলাহল, যানজট আর ব্যস্ততার মাঝেও মানুষ সময় বের করে নেয় প্রিয়জনদের সঙ্গে এই ছোট্ট অথচ গভীর মুহূর্তটি ভাগ করে নেওয়ার জন্য।
বন্ধুত্বের সম্পর্কেও ঈদের কোলাকুলি এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে। অনেকদিন পর দেখা হওয়া বন্ধুরা যখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, তখন সেই আলিঙ্গনে ফিরে আসে পুরোনো দিনের হাসি, দুষ্টুমি আর স্মৃতি। প্রবাসে থাকা কেউ যখন দেশে ফিরে ঈদের দিন পরিবারের সদস্যদের কোলাকুলি করে, তখন সেই মুহূর্তটি হয়ে ওঠে অশ্রুসিক্ত আনন্দের এক অপূর্ব দৃশ্য যেখানে অপেক্ষার দীর্ঘ সময় গলে যায় এক নিমিষেই।
শুধু পরিচিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এই কোলাকুলি। ঈদগাহ ময়দানে দাঁড়িয়ে অচেনা কারো সঙ্গে যখন আলিঙ্গন হয়, তখন সেই অপরিচিত মানুষটিও হয়ে ওঠে আপন। এই অদ্ভুত অথচ সুন্দর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হতে খুব বেশি কিছু লাগে না; লাগে শুধু আন্তরিকতা আর একটি উষ্ণ স্পর্শ।
ঈদের কোলাকুলির আরেকটি গভীর দিক হলো ক্ষমা ও পুনর্মিলন। “ঈদ মোবারক” বলার সঙ্গে সঙ্গে যখন দু’জন মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, তখন তা যেন এক নীরব অঙ্গীকার অতীতের সব কষ্ট, ভুল আর দূরত্ব পেছনে ফেলে নতুন করে শুরু করার। এই শিক্ষা যদি আমরা সারা বছর ধরে ধারণ করতে পারি, তবে আমাদের সমাজ আরও সহনশীল, আরও মানবিক হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনে প্রযুক্তির প্রভাব বেড়েছে। এখন অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করে ফেলে। কিন্তু তবুও, একটি বাস্তব কোলাকুলির অনুভূতি কোনো ভার্চুয়াল বার্তায় ধরা পড়ে না। একটি আলিঙ্গনের উষ্ণতা, হৃদস্পন্দনের কাছাকাছি চলে আসার সেই অনুভূতি এগুলোই মানুষকে সত্যিকার অর্থে সংযুক্ত করে।
ঈদের কোলাকুলি তাই কেবল আনন্দের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি সম্পর্কের পুনর্জন্ম, হৃদয়ের পুনর্মিলন এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। এটি আমাদের শেখায় জীবনের ব্যস্ততা, দূরত্ব আর বিভাজনের ভিড়ে সবচেয়ে মূল্যবান হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ। আর সেই সংযোগকে সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে গভীরভাবে প্রকাশ করে একটি আন্তরিক আলিঙ্গন।
শেষ পর্যন্ত, ঈদের কোলাকুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় শব্দের চেয়ে স্পর্শ বেশি সত্য, দূরত্বের চেয়ে ভালোবাসা বেশি শক্তিশালী, আর মানুষের পাশে মানুষই সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
